এক মাসে ১৮ জনের আত্মহত্যা

Spread the love

ফ্রন্টিয়ার রিপোর্ট :

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হঠাৎ করে আত্মহত্যার প্রবনতা বেড়ে গেছে। গত ১ মাসে একজন সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষার্থীসহ ১৮জন আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইলে এক যুবক ফেসবুক লাইভে এসে আত্মহত্যা করেছেন।

দাম্পত্য কলহ, পারিবারিক অশান্তিসহ বিভিন্ন কারনে তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। তবে তাদের বেশিরভাগই আত্মহত্যা করেছেন পোকা মারার ঔষধ “কেরির বড়ি” খেয়ে। হঠাৎ করে এই আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে সুশীল সমাজ। বিষয়টি গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার আইন-শৃংখলা কমিটির মাসিক সভায়ও আলোচনা হয়।

গত ৭ অক্টোবর থেকে গত ৯ নভেম্বর পর্যন্ত এই ১৮জন আত্মহত্যা করেন। এর মধ্যে চলতি মাসের ১০দিনের মধ্যে ৮জন আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়াদের মধ্যে বেশীরভাগই কিশোর-কিশোরী কিংবা মাঝ বয়সি।

গত ৭ অক্টোবর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার শিমরাইলকান্দির শান্ত মিয়া (১৮)। পরিবারের দায়িত্ব নিতে বলায় বাবা মোঃ শাহআলমের সাথে রাগ করে ৫ অক্টোবর কেরির বড়ি খায় শান্ত। জেনারেল হাসপাতাল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুইদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৭ অক্টোবর দুপুরে সে মারা যায়।

সর্বশেষ ৯ নভেম্বর বৃহস্পতিবার জেলার কসবা উপজেলার বিশারা বাড়ি গ্রাম থেকে গৃহবধূ তামান্না আক্তার (২৬) এর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পারিবারিক কলহের জের ধরে তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রাথমিক ভাবে পুলিশ ধারণা করছে।

এছাড়াও বিভিন্ন কারনে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়া অন্যান্যরা হলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার উত্তর পৈরতলার ছয়ঘড়িয়া পাড়ার আবুল কাসেমের মেয়ে সায়মা জেরিন (৩৫), সদর উপজেলার নাটাই দক্ষিণ ইউনিয়নের উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা আফসানা হক সাথী (৩৩), বিজয়নগর উপজেলার পত্তন গ্রামের পাপিয়া সুলতানা পুতুল (২৮), একই উপজেলার চান্দুরা গ্রামের মুসাব্বির মিয়া (৩০), আখাউড়া উপজেলার রাজপুর গ্রামের মামুন ভূঁইয়া (৪০), একই উপজেলার ভাটামাথা গ্রামের শায়লা আক্তার (৩৫), কসবা উপজেলার মারজান আক্তার লিয়া (১৫), নাসিরনগর উপজেলার কদমতলী গ্রামের শাকিল মিয়া (২০), একই উপজেলার ফান্দাউক গ্রামের মোতাব্বির চৌধুরী (১৮), ব্রাহ্মবাড়িয়া পৌর এলাকার ইয়াসমিন আক্তার (২০), ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার পশ্চিম মেড্ডা পীর বাড়ি এলাকার মোবারক হোসেন (২৫), আশুগঞ্জ উপজেলার সোনারামপুর গ্রামের শিপা আক্তার (১৭) ও সরাইল উপজেলার জুম্মান খাঁ (৩৫)।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা আফসানা হক সাথীর আত্মহত্যা নিয়ে। গত ১ নভেম্বর পোকা মারার ওষুধ খেয়ে তিনি আত্মহত্যা করেন। আফসানা হক সাথী দুই ছেলে সন্তানের জননী।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার নাটাই দক্ষিণ ইউনিয়নে উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন আফসানা হক। আশুগঞ্জ উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামের ফজলুল হকের মেয়ে আফসানার সাথে ২০১১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন বিষ্ণুপুর গ্রামের আলী হায়দারের ছেলে ইমরান খান সবুজের বিয়ে হয়। যৌতুকের চাপ, স্বামীর পরকীয়া ও মারধর সইতে না পেরে আফসানা আত্মহত্যার পথ বেছে নেন বলে পরিবারের লোকজন অভিযোগ করেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার পশ্চিম মেড্ডা পীর বাড়ি এলাকার আব্দুল আলীমের ছেলে দুবাই প্রবাসী মোবারক হোসেন (২৫) গত ৪ নভেম্বর পৌর এলাকার ছয়বাড়িয়া গ্রামে শ্বশুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যা করেন। মোবারক হোসেন ৭ মাস আগে বিয়ে করেছিলেন।

গত ২ নভেম্বর মায়ের সাথে অভিমান করে জেলার আশুগঞ্জ উপজেলার সোনারামপুর গ্রামের বাসিন্দা ও মাদরাসা শিক্ষার্থী শিপা আক্তার বাড়ির পাশের একটি ভবনের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে।

১ নভেম্বর একই দিনে আত্মহত্যা করে তিনজন। এর মধ্যে বাবা মায়ের সাথে অভিমান করে আখাউড়া উপজেলার নুরপুর গ্রামের সুমন মিয়ার মেয়ে নুপুর আক্তার (১৫) ইঁদুর মারার বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করে। একই দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার বিদ্যাকুট গ্রামের ফিরোজ মিয়ার ছেলে সিদ্দিক মিয়া (৪৮) কেরিরবড়ি খেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। তিনি মানসিক অস্থিরতার পাশাপাশি হতাশায় ভুগছিলেন বলে পারিবারিক সূত্র জানায়।

একই দিন স্ত্রীর সাথে অভিমান করে গলায় ফাঁস লাগিয়ে নিজবাড়িতে আত্মহত্যা করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলার চম্পকনগর ইউনিয়নের নুরপুর গ্রামের আলী আহম্মেদের ছেলে শাওন মিয়া। স্ত্রী পরকীয়ায় জড়িত এমন সন্দেহ থেকে তিনি গলায় বেল্ট পেঁচিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

কসবা উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়নের গোপীনাথপুর গ্রামের দক্ষিণপাড়ার শাহীন মিয়ার মেয়ে মারজান আক্তার এসএসসি’র নির্বাচনী পরীক্ষায় পাস করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। আখাউড়া উপজেলার আজমপুর এলাকায় গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

গত ৭ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার উত্তর পৈরতলার ছয়ঘড়িয়া পাড়ার আবুল কাসেমের মেয়ে সায়মা জেরিন শ্বশুরবাড়িতে ‘কেরিরবড়ি’ খেয়ে আত্মহত্যা করেন। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার গোকর্ণঘাট দক্ষিণপাড়ার গণি মিয়ার ছেলে হান্নানের স্ত্রী। জেরিনের বাবার আবুল কাসেমের অভিযোগ যৌতুকের জন্য তার মেয়েকে মারধোর শেষে মুখে বিষ ঢেলে হত্যা করা হয়েছে। তবে পুলিশ জানায়, জেরিন আত্মহত্যা করেছে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। জেরিন দুই কন্যা সন্তানের জননী ছিলেন। ১৪ বছর আগে হান্নানের (নাগর হান্নান) সাথে তার বিয়ে হয়েছিলো।

গত ৮ নভেম্বর ফেসবুক লাইভে এসে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন জুম্মান খাঁ (৩৫) নামে এক যুবক। স্ত্রীর সাথে অভিমান করে জুম্মান আত্মহত্যা করেছে বলে পরিবারের লোকজন জানান। পুলিশ জানায়, জুম্মান মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ী ছিলেন। হতাশা থেকেই সে আত্মহত্যা করেছে।

এদিকে গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত সদর উপজেলার আইন-শৃংখলা কমিটির মাসিক সভায় সম্প্রতি আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সভায় বক্তারা কিশোর-কিশোরীদের প্রতি বিশেষ নজর রাখার জন্য অভিভাবকদের প্রতি আহবান জানান এবং কৃষি অফিসারের লিখিত অনুমতি ছাড়া কেরির বড়ি যাতে বিক্রি না করা হয় সে ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহনের দাবি তুলেন।

এ ব্যাপারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ এ এস এম শফিকুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আত্মহত্যার ক্ষেত্রে পারিবার ছোট হয়ে যাওয়া, মাদকাসক্তি, মোবাইল ফোনে আসক্তিসহ নানা কারণ আছে। এক্ষেত্রে পারিবারিক শিক্ষাটা বড়। পরিবারের ছোট সদস্যদের মাঝে সফলতা উদযাপনের পাশাপাশি ব্যর্থতা মেনে নেওয়ার মানসিকতা সৃষ্টি করতে হবে। সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড ও খেলাধুলায় মনোনিবেশ করাতে হবে।

এ ব্যাপারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও জেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি ডাঃ মোঃ আবু সাঈদ বলেন, ‘শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশের যে সময়টা তখন তাদেরকে পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ রেখে সাপোর্ট দিতে হবে। তাদের মধ্যে কোনো হতাশা দেখা দিলে সেটা দূর করতে কাজ করতে হবে।

About The Author

You May Also Like

More From Author

+ There are no comments

Add yours